শীতে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বাড়ে কেন? ঘরোয়া ও চিকিৎসা পরামর্শ
Home >Blogs >শীতে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বাড়ে কেন? ঘরোয়া ও চিকিৎসা পরামর্শ

শীতে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বাড়ে কেন? ঘরোয়া ও চিকিৎসা পরামর্শ

Summary

শীতের সকাল মানেই হালকা কুয়াশা, গরম চায়ের ধোঁয়া, আর লেপ-কম্বলের আরাম। কিন্তু যাঁরাআর্থ্রাইটিসে ভোগেন, তাঁদের কাছে শীতকাল অনেক সময়ই আরামের বদলে ব্যথা-বেদনা আর জড়তারবার্তা নিয়ে আসে।

শীতকালে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বাড়ে, এবং তার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। ঋতু পরিবর্তন, তাপমাত্রা কমে যাওয়া, বায়ুর চাপের হেরফের, সব মিলিয়ে শরীরের জয়েন্টগুলো যেনবেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ফলে হাঁটু, কনুই, আঙুল, কোমর কিংবা ঘাড়ের সন্ধিগুলোতে ব্যথা ওশক্তভাব বেড়ে যায়।

শীতে ব্যারোমেট্রিক প্রেসার বা বায়ুর চাপ কমে যায়। এই পরিবর্তনের ফলে জয়েন্টের ভেতরের টিস্যু ওতরল পদার্থের উপর চাপের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যার প্রভাব আমরা ব্যথা হিসেবে অনুভব করি। ঠান্ডাতাপমাত্রায় রক্তবাহগুলো কিছুটা সংকুচিত হয়ে পড়ে, ফলে জয়েন্টে রক্ত চলাচল ধীর হয়। এর ফলেজয়েন্টে পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, পেশি ও লিগামেন্ট শক্ত হয়ে ওঠে, এবং স্বাভাবিক নড়াচড়াকঠিন লাগে। সিনোভিয়াল ফ্লুইড, যা জয়েন্টকে লুব্রিকেট বা পিচ্ছিল রাখতে সাহায্য করে, শীতেতুলনামূলক ঘন হয়ে পড়ে। এতে জয়েন্ট নড়াতে বেশি ঘর্ষণ তৈরি হয় এবং ব্যথা-জড়তা আরও বাড়ে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল শীতে অনেকেই শারীরিক সক্রিয়তা কমিয়ে ফেলেন। ঠান্ডার কারণেবাইরে বেরিয়ে হাঁটা বা ব্যায়াম করার আগ্রহ কমে যায়। শরীর যত কম নড়ে, জয়েন্ট তত বেশি শক্ত হয়, এটি একটি চক্রের মতো কাজ করে। মানসিক দিকটিও অবহেলার নয়। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা শীতে বিষণ্ণতা বামুড সুইং বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতাকেও কমিয়ে দেয়।

শীতে আর্থ্রাইটিসের কোন লক্ষণগুলো একদমই অবহেলা করা উচিত নয়?

শীতকালে আর্থ্রাইটিসের সাধারণ কিছু লক্ষণ দেখা যায়, যেমন জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা, লালচে ভাব, সকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁটু বা আঙুল নাড়াতে কষ্ট হওয়া, হঠাৎ ব্যথা বেড়ে গিয়ে স্বাভাবিক কাজ বন্ধ হয়েযাওয়া, হাঁটতে গিয়ে পায়ে ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, কিংবা ব্যথার কারণে রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া।

তবে কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো রেড ফ্ল্যাগ হিসেবে ধরা হয়, যেমন- 

  • ব্যথা সহ্য করার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এবং নড়াচড়া একেবারে কমে যাওয়া
  • জয়েন্টে অতিরিক্ত ফোলা বা স্পর্শে তীব্র ব্যথা
  • শরীরে কাঁপুনি বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বর
  • পা বা আঙুলে অবশভাব, ঝিনঝিন করা, বা জ্বালা অনুভূতি
  • হাঁটুর লক হয়ে যাওয়া, বা সিঁড়ি উঠতে-নামতে অসম্ভব কষ্ট
  • ব্যথা এক সপ্তাহের বেশি তীব্রভাবে স্থায়ী থাকা

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ এগুলো অনেক সময়ইনফ্ল্যামেশন বাড়া, কার্টিলেজ ক্ষয়, কিংবা নার্ভ কম্প্রেশনের ইঙ্গিত দেয়।

শীতে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা কমাতে কার্যকর কিছু ঘরোয়া সমাধান

শীতে ব্যথা কমাতে সবসময় ওষুধই প্রথম সমাধান নয়। দৈনন্দিন জীবনে কিছু সহজ পরিবর্তনও বড়পার্থক্য তৈরি করতে পারে, যেমন, 

  • গরম সেঁক: গরম জলের ব্যাগ বা হিট প্যাড দিয়ে ব্যথার জায়গায় ১০-১৫ মিনিট সেঁক দিলে রক্ত চলাচল বাড়ে, পেশিশিথিল হয়, এবং ব্যথা সাময়িক হলেও অনেকটা কমে।
  • কুসুম গরম জলে স্নান: কুসুম গরম জলে স্নান করলে জয়েন্টের স্টিফনেস বা শক্তভাব কম অনুভূত হয়।
  • হালকা স্ট্রেচিং ও যোগাসন: শরীর নাড়ানো যত কমে, ব্যথা তত বাড়ে, তাই বাড়ির মধ্যেই হালকা স্ট্রেচিং, সূর্য নমস্কার, বা যোগাসনকরলে জয়েন্ট নমনীয় থাকে।
  • তিলের তেল বা সরিষার তেল দিয়ে মালিশ: গরম করে তিল বা সরিষার তেল দিয়ে জয়েন্টে মালিশ করলে ব্যথা কম অনুভূত হয় এবং জড়তা কাটাতেসাহায্য করে।
  • হলুদ-দুধ: হলুদে থাকা কারকিউমিন একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান। রাতে গরম দুধে ১ চা-চামচহলুদ মিশিয়ে খেলে ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
  • আদা-মধু চা: আদা ব্যথা ও ইনফ্ল্যামেশন কমাতে সাহায্য করে। গরম জলে আদা ফুটিয়ে মধু মিশিয়ে চা হিসেবে খেলেউপকার পাওয়া যায়।
  • জয়েন্ট উষ্ণ রাখা: শীতকালে উলের মোজা, গ্লাভস, হাঁটু-ক্যাপ, বা মাফলার ব্যবহার করলে জয়েন্ট ঠান্ডা থেকে সুরক্ষিতথাকে, ফলে ব্যথা কম ট্রিগার হয়।
  • হাইড্রেশন বজায় রাখা: শীতে ঘাম কম হয় বলে অনেকেই জল কম খান। কিন্তু শরীরে জলের অভাব হলে জয়েন্টের ব্যথা আরওবাড়ে। তাই শীতেও পর্যাপ্ত জল খাওয়া জরুরি।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা: অতিরিক্ত ওজন হাঁটু ও কোমরের জয়েন্টে বাড়তি চাপ তৈরি করে। শীতে ওজন বেড়ে গেলে ব্যথারতীব্রতাও বাড়তে পারে।

শীতে আর্থ্রাইটিস ব্যথার জন্য চিকিৎসায় কী কী থেরাপি ও চিকিৎসা কার্যকর?

ব্যথা যদি ঘরোয়া সমাধানে না কমে, তখন চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। শীতকালে আর্থ্রাইটিসেরব্যথা নিয়ন্ত্রণে সাধারণত যে চিকিৎসাগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলি হল-

  • ব্যথানাশক ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ওষুধ: ডাক্তার রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী ব্যথানাশক ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন। এগুলো ইনফ্ল্যামেশন কমিয়ে ব্যথানিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  • ফিজিওথেরাপি: শীতকালে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি সেশন জয়েন্টের মোবিলিটি ধরে রাখতে, পেশি শক্তি বাড়াতে, এবংব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
  • হাইড্রোথেরাপি: উষ্ণ জলে বিশেষ এক্সারসাইজ করানো হয়, যা জয়েন্টে কম চাপ দিয়ে ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
  • ইনজেকশন থেরাপি: জয়েন্টে স্টেরয়েড বা হায়ালুরোনিক অ্যাসিড-ভিত্তিক ইনজেকশন অনেক সময় ব্যথা কমাতে ও জয়েন্টকেলুব্রিকেট রাখতে সাহায্য করে (ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী)।
  • ভিটামিন-Dক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্টেশন: শীতে সূর্যের আলো কম পাওয়ার কারণে ভিটামিন-D এর ঘাটতি বাড়ে, যা আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বাড়াতেপারে। ডাক্তার প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্ট সাজেস্ট করেন।
  • লাইফস্টাইল-বেসড ট্রিটমেন্ট প্ল্যান: ওষুধের পাশাপাশি ডাক্তার ডায়েট, ঘুম, হাঁটার রুটিন, ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে গাইড করেন, কারণআর্থ্রাইটিস শুধু জয়েন্টের সমস্যা নয়, এটি সামগ্রিক শরীর-স্বাস্থ্যের সাথে যুক্ত।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

অনেকেই শীতের ব্যথাকে ঋতুর স্বাভাবিক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু ব্যথা যখন

  • দিনদিন বাড়তে থাকে
  • হাঁটা-চলা বা দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে
  • ঘুম নষ্ট করে দেয়
  • বা জয়েন্ট ফুলে শক্ত হয়ে যায়

তখন আর দেরী করা ঠিক নয়। দ্রুত চিকিৎসকের সাথে কথা বলা দরকার। আর্থ্রাইটিসের সঠিকচিকিৎসা ও গাইডলাইন ব্যথা কমাতে, জয়েন্ট ক্ষয় ধীর করতে, এবং ভবিষ্যতের জটিলতা আটকাতেসাহায্য করে।

সচেতন থাকুন, ঠিক সময়ে ডাক্তার দেখান

শীতকাল আর্থ্রাইটিস রোগীদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হলেও, সচেতনতা ও সঠিক যত্নে এই সময়টা অনেকটাইসহজ করা যায়। শরীর উষ্ণ রাখা, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত জল, এবং সময়মতোচিকিৎসা, এসব ছোট ছোট অভ্যাস ব্যথা কমাতে বড় ভূমিকা রাখে।

Frequently Asked Questions

শীতে জয়েন্টের ব্যথা কেন বাড়ে?

শীতে বায়ুর চাপ কমে যায়, শরীরের ভেতরের রক্তবাহ সংকুচিত হয়ে যায়, জয়েন্টের ভেতরের তরলশুকনো হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এরফলে ব্যথা বাড়ে।

শীতে জয়েন্টের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী করব?

গরম সেঁক দিন, উষ্ণ জলে স্নান করুন, পুষ্টিকর খাবার খান, এবং হালকা ব্যায়াম করুন।

জয়েন্টের ব্যথা কোন পর্যায়ে গেলে ডাক্তার দেখাবো?

জয়েন্ট পেইন অসহ্য হয়ে উঠলে, জয়েন্ট ফুলে উঠলে, রোজকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধাএলে অবশ্যই ডাক্তার দেখাবেন। 

Written and Verified by:

Dr. Rakesh Rajput

Dr. Rakesh Rajput

HOD & Director - Orthopaedics Exp: 36 Yr

Orthopaedics

Book an Appointment

Dr. Rakesh Rajput is the HOD & Director of Orthopaedics Dept. at CMRI, Kolkata, with over 25 years of experience. He specializes in robotic knee and hip replacement, joint preservation, complex trauma care, and revision surgeries.

Related Diseases & Treatments

Treatments in Kolkata

Orthopedics & Joint Replacement Doctors in Kolkata

NavBook Appt.WhatsappWhatsappCall Now