ডায়রিয়া হলো পাতলা ও ঘন ঘন মলত্যাগের অবস্থা, যা প্রায়শই ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী সংক্রমণ বা দূষিত খাবার ও পানির কারণে হয়। এতে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বেশি থাকে, যা শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। পর্যাপ্ত তরল ও ওআরএস সেবন, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এর প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আমাদের দেশ ভারতবর্ষ ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত। ক্রান্তীয় অঞ্চলে যে দেশগুলো অবস্থিত সেই দেশের অধিবাসীদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ লক্ষ্য করার মত। মূলত ভারত, বাংলাদেশ,পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং আফ্রিকার মত গরমের দেশগুলোতে এই রোগটিতে প্রতি বছর বহু মানুষ আক্রান্ত হন।
আসুন আজ আমরা ডায়রিয়া রোগটি সম্পর্কে কিছু কথা জেনে নিই। ডায়রিয়া শব্দটির সাথে আমরা ছোটোবেলা থেকেই পরিচিত। সারা জীবনে একবারও ডায়রিয়া হয় নি এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া ভার।
ডায়েরিয়া বা ডায়রিয়া – মূলত পেটের রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে জল বেরিয়ে যায়। পাতলা মল, যা কখনো কখনো শ্লেষ্মাযুক্ত,সঙ্গে পেট ব্যাথা,গা গুলিয়ে ওঠা এই উপসর্গ গুলি দেখা যায়। একদিকে যেমন শুধু ডায়েরিয়া হতে পারে আবার কখনও কখনও তা অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। যার মধ্যে রয়েছে বমি বমি ভাব বমি, পেটে ব্যথা বা ওজন হ্রাস হওয়া। ডায়রিয়া সাধারণত স্বল্পস্থায়ী হয় কয়েক দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। কিন্তু যখন ডায়রিয়া কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় তখন বুঝতে হবে যে অন্য কোনো সমস্যা আছে। যেমন সেগুলো হতে পারে আইবিএস (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম )বা ক্রমাগত সংক্রমণ আইবিডি বা সিলিয়াক ডিজিজ অথবা অন্ত্রের প্রদাহ সহ অন্যান্য কঠিন ব্যাধি।
নিচের লক্ষণ এবং উপসর্গগুলি দেখা গেলে ধরে নেওয়া হয় একজন ব্যক্তি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।
ডায়ারিয়ার সবথকে বড় পথ্য হল ওআরএস- এর জল।দুপুরে ভাতের সঙ্গে পাতলা ডালের জল,পাতলা লিকার চা খেতে পারেন। আসলে ডায়েরিয়ায় দেহ থেকে প্রচুর জল বেরিয়ে যায় তাই জলের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ঘন ঘন ওআরএস- এর জল খাওয়া দরকার।রাতের দিকে হালকা খাবার খাওয়া উচিত।
ডায়রিয়া হলে জলের পরিমাণ বেশি আছে এ ধরনের খাবার বেশি খাওয়া দরকার। তরল জাতীয় খাবার যেমন ঝোল,জুস ইত্যাদি খান অবশ্যই প্রচুর জলপান করুন।আপনার মল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাতে শুরু করলে ধীরে ধীরে সেমিসলিড এবং কম ফাইবারযুক্ত খাবার আহারে যোগ করুন।
কফি এবং অ্যলকোহল পানকে পুরোপুরি বিদায় জানান।কোনো রকম মশলাদার রিচ খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।গম এবং দুধের তৈরী খাবার এড়িয়ে চলুন।সোডা ক্র্যাকার, োস্ট ডিম না খাওয়ার চেষ্টা করুন।
ডায়রিয়া অনেক কারণেই হতে পারে যার মধ্যে রয়েছে-
ডায়ারিয়া আসলে একটি আন্ত্রিক রোগ মূলত প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ।আসুন একটু বিস্তারিত ভাবে এই বিষয়টি ওপর আলোকপাত করা যাক।
দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ার অন্যান্য অনেক কারণ রয়েছে, যেমন আইবিএস, মাইক্রোস্কোপিক কোলাইটিস, ক্রোনস ডিজিজ, আলসারেটিভ কোলাইটিস, সিলিয়াক ডিজিজ এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ।
ডায়রিয়া ডিহাইড্রেশনের কারণ, যার সময়মতো চিকিৎসা না করলে জীবনহানিও হতে পারে। দুর্বল ব্যক্তি, বয়স্ক, ও শিশুর জন্য ডিহাইড্রেশন বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে। ডিহাইড্রেশনের গুরুতর লক্ষণ থাকলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ।
এখন জেনে রাখুন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডিহাইড্রেশনের যে লক্ষণগুলো পরিলক্ষিত হয়-
আবার শিশু এবং ছোট বাচ্চাদের মধ্যে ডিহাইড্রেশনের যে ইঙ্গিতগুলো লক্ষ্য করা যায়-
আপনি যদি একজন প্রাপ্তবয়স্ক হন এবং নিচের সমস্যগুলো অনুভব করেন তবে দেরি না করে অবশ্যই একজন ডাক্তারের কাছে যান।
প্রায়শই দেখা যায় বাইরে বেড়াতে গিয়ে ডায়েরিয়ায় অনেক ভ্রমনকারী আক্রান্ত হয়ে পরেন।সেক্ষেত্রে-
আপনার ডাক্তারবাবুর পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক সহ অন্যান্য ওষুধের একটি প্যাক তৈরী করে আগে থেকেই সঙ্গে রাখুন।এর সাথে ওআরএস অবশ্যই রাখবেন।আর প্রয়োজনে সেখানকার লোকাল কোনো ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
ডায়রিয়ার ফলে শিশুদের, বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের শরীর থেকে দ্রুত জল বেরিয়ে যেতে পারে।তাই 24 ঘন্টার মধ্যে যদি আপনার সন্তানের ডায়রিয়ার উন্নতি না হয় তাহলে আর দেরি না করে চটজলদি আপনার সন্তানের ডাক্তারবাবুকে কল করুন।নিচের লক্ষণগুলো দেখা গেলে একদম ফেলে রাখা ঠিক না।
শিশুদের ভাইরাল ডায়রিয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল রোটোভাইরাস, দুটি অনুমোদিত ভ্যাকসিনের মধ্যে একটি দিয়ে আপনি আপনার সন্তানকে এর হাত থেকে সুরক্ষা দিতে পারেন। তবে আপনার শিশুর টিকা দেওয়ার বিষয়ে সর্বদা আপনার শিশুর ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মেনে চলুন।
সংক্রামক ডায়রিয়ার বিস্তার রোধ করতে আপনার নিম্নলিখিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলা প্রয়োজন-
ডায়রিয়া হল স্বভাবিকের তুলনায় বেশি ঘন ঘন পাতলা মলত্যাগ।কখনো কখনো এর প্রকোপ খুব বেশি হয়ে পড়লেও সেরকম ভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, যদি না এটা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। যদিওএটি বেশ বিরক্তিকর এবং অপ্রীতিকর ঘটনা।তবে একটু সচেতনতা, সুষ্ঠু স্বাস্থ্যবিধি এবং বেশ কিছু সাধারণ ঘরোয়া প্রতিকার মেনে চললে তা সাধারণতকয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহেরমধ্যেই ঠিক হয়ে যায়।তবে এর বেশি সময় ধরে থাকলে অবিলম্বে ডাক্তারি সহায়তা নেওয়া আবশ্যক।
আমাদের মতো গরম দেশে ডায়রিয়া খুবই সাধারণ একটি রোগ। অতএব, এই বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় চাপ নেবেন না, তবে যদি এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তবে অবিলম্বে একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। শিশুদের ডায়রিয়া হলে সাথে সাথে ডাক্তারবাবুকে জানান এবং তার পরামর্শ মত চলুন।স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এবং প্রয়োজনে ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নিলে খুব সহজেই এর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
ওআরএস, সেদ্ধ ভাত, কলা, স্যুপ, হালকা খাবার এবং প্রচুর পানি।
তেল-ঝাল খাবার, দুধজাতীয় খাবার (কিছু ক্ষেত্রে), কাঁচা খাবার ও রাস্তার খাবার।
সাধারণত ২–৩ দিনের মধ্যে সেরে যায়, তবে গুরুতর হলে বেশি সময় লাগতে পারে।
নিরাপদ পানি পান, খাবারের আগে হাত ধোয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সঠিকভাবে খাবার রান্না করা।
ডায়রিয়া ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হলে, রক্তযুক্ত মল, উচ্চ জ্বর, বা তীব্র ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ দেখা দিলে।
প্রতিবার পাতলা মলত্যাগের পর এক গ্লাস বা এক কাপ ওআরএস খাওয়া উচিত।
ওআরএস, মায়ের দুধ (যদি শিশু দুধপান করে), তরল খাবার দিন এবং ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ থাকলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যান।
Written and Verified by:
© 2024 CMRI Kolkata. All Rights Reserved.