শীতে ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিস: কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন?
Home >Blogs >শীতে ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিস: কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন?

শীতে ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিস: কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন?

Summary

শীতকাল মানেই সুস্বাদু খাবার খাওয়া আর ব্যায়াম কমে যাওয়া। ফলে ওজন বেড়ে যেতে দেরী হয় না। এইব্লগে আমরা সেটাই আলোচনা করবো।

শীতকাল এলেই যেন শরীর আর মন দুটোই একটু বেশি আরাম চায়। সকালে লেপের ওম ছাড়তে ইচ্ছেকরে না, সন্ধ্যায় চা-পকোড়ার আড্ডা জমে ওঠে, আর ঘরে বসে সুস্বাদু খাবারের চাহিদাও বেড়ে যায়।বছরের অন্য সময় যে রুটিনটা বেশ সহজে মানা যায়, শীতে এসে সেটা অনেকেরই এলোমেলো হয়ে যায়।আর ঠিক এই সময়েই শরীরের ওজন বাড়তে শুরু করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বাড়তি চিন্তারকারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শীতে ওজন বৃদ্ধি শুধু পোশাক টাইট হওয়া বা আয়নায় শরীর ভারী দেখানোর ব্যাপার নয়, বরং এরপ্রভাব পড়ে রক্তে শর্করার মাত্রা, ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা, বিপাক হার, এমনকি হার্টের স্বাস্থ্যেও। তাইশীতের শুরু থেকেই যদি কিছু সাধারণ অভ্যাস মেনে চলা যায়, তাহলে ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ব্লাড সুগারম্যানেজমেন্ট, দুটোই সহজ হয়।

শীতে ওজন বৃদ্ধি কেন বেশি হয়?

শীতে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই হল তাপমাত্রা ধরে রাখা। ঠাণ্ডার কারণে শরীর ক্যালোরি সংরক্ষণকরতে চায়, ফলে খিদে বাড়ে এবং হাই-ক্যালোরি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেশি তৈরি হয়। বিশেষতকার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট জাতীয় খাবার শরীরকে দ্রুত গরম অনুভূতি দেয়, তাই মিষ্টি, ভাজা খাবার, পরোটা, ঘুগনি, পিঠে, হট চকোলেট বা চিজ-বাটার সমৃদ্ধ খাবার শীতে বেশি খাওয়া হয়।

এর সঙ্গে যোগ হয় কম শারীরিক পরিশ্রম। শীতের সকালে হাঁটতে বেরোনো বা জিমে যাওয়া অনেকেরকাছেই কষ্টসাধ্য লাগে। দিনের আলো কম থাকা, সন্ধ্যা দ্রুত নেমে আসা, আর ঠান্ডা বাতাস, সব মিলিয়েশরীরচর্চার সময় কমে যায়। ফলাফল? ক্যালোরি খরচ কম, ক্যালোরি গ্রহণ বেশি, এটাই ওজন বৃদ্ধির মূলকারণ।

এছাড়া শীতে ঘাম কম হয়, জল খাওয়ার পরিমাণ কমে যায়, শরীরে ডিহাইড্রেশন তৈরি হয়, আর বিপাকহারও ধীর হয়ে পড়ে। যাঁরা ইতিমধ্যেই ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাঁদের শরীর এই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুতমানিয়ে নিতে পারে না, ফলে ওজন বৃদ্ধি এবং ব্লাড সুগারের ভারসাম্যহীনতা, দুটোই বেশি দেখা যায়।

ঠান্ডা আবহাওয়া ব্লাড সুগার ও মেটাবলিজমে কী প্রভাব ফেলে?

ঠান্ডা পরিবেশে শরীর স্ট্রেস হরমোন (কর্টিসল, অ্যাড্রেনালিন) বেশি নিঃসরণ করে, যা রক্তে শর্করার মাত্রাবাড়িয়ে দিতে পারে। শীতে ইনসুলিন সেনসিটিভিটিও অনেক সময় কমে যায়, অর্থাৎ ইনসুলিন শরীরে যেকাজটা করার কথা, সেটা ঠিকমতো করতে পারে না। এর ফলে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়েপড়ে।

বিপাক হার শীতে স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। খাবার থেকে প্রাপ্ত শক্তি শরীর ভাঙতে ও ব্যবহার করতেবেশি সময় নেয়। বিশেষ করে রাতে বেশি খেলে, শরীর সেই ক্যালোরি সহজে খরচ করতে পারে না, যাজমা হয়ে চর্বিতে রূপ নেয়। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এই চর্বি জমা হওয়া আরও বিপজ্জনক, কারণএটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আরও বাড়িয়ে দেয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শীতে রক্তবাহগুলি সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে রক্তপ্রবাহ ধীর হয়। এরপ্রভাবে শুধু সুগার নয়, রক্তচাপও বেড়ে যেতে পারে। তাই শীতে ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্ট মানে শুধু মিষ্টিকম খাওয়া নয়, বরং পুরো লাইফস্টাইলের ভারসাম্য বজায় রাখা।

শীতের ওজন বৃদ্ধির ফলে ডায়াবেটিসের সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলি

ডায়াবেটিস রোগীদের শরীর শীতে বেশ কিছু সংকেত দিতে শুরু করে, যা অনেক সময়ই সাধারণশীতকালীন সমস্যা বলে ভুল বোঝা হয়। কিন্তু একটু খেয়াল করলে বোঝা যায়, এগুলো ব্লাড সুগার এবংওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।

যেমন,

  • খিদে অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া
  • খাবার পরে অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘুম ঘুম ভাব
  • ঘন ঘন প্রস্রাব বা রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া
  • সকালে ঘুম থেকে উঠেও শরীরে ভারী ভাব
  • মিষ্টি বা ভাজা খাবারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ
  • গ্লুকোমিটারে শর্করার মাত্রা অনিয়মিত ওঠানামা
  • পেটের অংশে দ্রুত চর্বি জমা হওয়া
  • পা-হাতে শিরশির ভাব বা ব্যথা বেড়ে যাওয়া

এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে, শীতের কারণে ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্ট রুটিনে বদল আনাজরুরি।

ওজন বৃদ্ধি রোধ ও ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে শীতকালীন খাদ্যাভ্যাস

শীতে ডায়েট মানে কঠোর ডায়েট নয়, বরং স্মার্ট ডায়েট। ডায়াবেটিস থাকলে এমন খাবার বেছে নিতেহবে, যা শরীর গরম রাখবে, পেট ভরাবে, কিন্তু ব্লাড সুগার হঠাৎ বাড়াবে না।

শীতে খাদ্য পরিকল্পনায় রাখতে পারেন-

  • হাই-ফাইবার খাবার: ওটস, ডালিয়া, চিয়া সিড, শাক-সবজি, মেথি, বাঁধাকপি, গাজর, বীট, মিষ্টি কুমড়ো, মুগ ডাল, এসবখাবার হজম ধীরে করে, ফলে সুগার স্পাইক হয় না।
  • ভালো প্রোটিন: ডিম, চিকেন, মাছ, পনির, সয়াবিন, ছোলা, মুগ ডালের চিলা, এগুলো খিদে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবংমেটাবলিজম সক্রিয় রাখে।
  • স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: বাদাম, চিনাবাদাম, আখরোট, তিল, সর্ষের তেল, ঘি খুব অল্প পরিমাণে, এসব ফ্যাট শরীর গরম রাখতেসাহায্য করে, কিন্তু মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ।
  • শীতে মিষ্টি খাবার একেবারে বন্ধ নয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত: পিঠে বা মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হলে চিনির বদলে গুড় খুব ব্যবহার করুন। আর সময় বেছে নিন দিনের প্রথমভাগ, রাতে নয়।
  • জল খাওয়ার অভ্যাস ধরে রাখুন: ঘাম কম হলেও শরীরের কোষ ঠিকমতো কাজ করতে জল লাগে। হালকা গরম জলও খেতে পারেন।
  • রাতের খাবার হালকা রাখুন: রুটি-সবজি বা স্যুপ, স্যালাড, গ্রিলড খাবার খান। রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন।

শীতে সক্রিয় থাকতে নিরাপদ ব্যায়াম ও দৈনন্দিন অভ্যাস

শীতে শরীরচর্চা বন্ধ করে দেওয়া মানে নিজের বিপাক হার আরও ধীর করে দেওয়া। তাই এমন ব্যায়ামবেছে নিতে হবে, যা নিরাপদ, সহজ, এবং ঘরের মধ্যেও করা যায়।

প্রতিদিন করতে পারেন,

  • 30–40 মিনিট দ্রুত হাঁটা (সকালে রোদ ওঠার পর)
  • ঘরে যোগব্যায়াম, বিশেষত সূর্য নমস্কার, বজ্রাসন ইত্যাদি
  • ১০-১৫ মিনিট স্ট্রেচিং
  • স্কোয়াট, লাঞ্জ, ওয়াল পুশ-আপ, স্টেপ-আপ
  • নাচ বা ঘরের কাজ
  • লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার

দৈনন্দিন অভ্যাসে যোগ করুন,

  • সকালের রোদে ১০-১৫ মিনিট বসা (ভিটামিন D বাড়ায়)
  • চা-কফিতে চিনি না দেওয়া
  • সন্ধ্যায় স্ন্যাক্স হিসাবে স্যুপ বা মুগ ডালের চিলা খাওয়া
  • ডিনারের পর ১০ মিনিট হাঁটা
  • রাতে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম

শীতকাল শরীরের শত্রু নয়, যদি আপনি অভ্যাসগুলো এই ঋতুর সঙ্গে মানিয়ে নেন। ওজন বৃদ্ধি এবংডায়াবেটিস, দুটোই লাইফস্টাইল ডিজিজ, তাই নিয়ন্ত্রণও লাইফস্টাইলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। শীতেখেতে হবে, ঘুরতেও হবে, উৎসবও উপভোগ করতে হবে, কিন্তু সচেতনভাবে।

Frequently Asked Questions

শীতকালে ওজন বেড়ে যায় কেন?

অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়া, শরীরচর্চা কমিয়ে দেওয়া এসব কারণে শীতকালে সহজেই ওজনবেড়ে যায়।

শীতকালে ডায়েট কেমন হওয়া উচিত?

ফাইবারযুক্ত খাবার বেশি খান, মিষ্টি কম খান, এবং রাতের খাবার হালকা রাখুন।

শীতের সময় কীভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখবো?

সময় মতো এবং মেপে খাওয়াদাওয়া করুন, পর্যাপ্ত জল খান, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুনতাহলেই অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন।

Written and Verified by:

Dr. Sukumar Mukherjee

Dr. Sukumar Mukherjee

Consultant Exp: 65 Yr

Internal Medicine

Book an Appointment

Prof. Dr. Sukumar Mukherjee is a Senior Consultant in Internal Medicine Dept. at CMRI, Kolkata. He specializes in internal medicine, rheumatology, and clinical management of complex systemic disorders.

Related Diseases & Treatments

Treatments in Kolkata

Internal Medicine Doctors in Kolkata

NavBook Appt.WhatsappWhatsappCall Now